বন্ড সুতার সিন্ডিকেটে নাজেহাল ব্যবসায়ীরা


BANGLAR NARAYANGANJ | Banglar Narayanganj প্রকাশিত: Oct 23, 2026 বন্ড সুতার সিন্ডিকেটে নাজেহাল ব্যবসায়ীরা
স্টাফ রিপোর্টার: বন্ড সুতা খোলা বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ। তবে এই সুতা কোনোভাবে সংগ্রহ করে খোলা বাজারে বিক্রি করা গেলে মুনাফা কল্পনাতীত। নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার এক সময় বৈধ সুতা ব্যবসায়ীদের আতুরঘর হিসেবে পরিচিত ছিলো। কিন্ত এখন এখানকার ব্যবসায়ীরাই মেতে উঠেছেন অবৈধ বন্ড সুতার বেচাকেনায়। কি কারণে নিষিদ্ধ এই ব্যবসায় সবার আগ্রহ তার উত্তর ব্যবসায়ীরাই দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সার্বিক পরিস্থিতি এবং অতিরিক্ত মুনাফার লোভেই সবাই বন্ড সুতার ব্যবসায় নাম লেখাচ্ছেন। তবে একটি সিন্ডিকেট অতি মুনাফা লাভের আশায় বন্ড সুতার বিক্রির চেইন তৈরি করে প্রতি বছর বিশাল অংকের সুতা বিক্রি করে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ফাকি দিচ্ছে। 

গত ১৯ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে একটি অনিবন্ধিত গোডাউনে অভিযান চালিয়ে ৮৭ হাজার ৩৯০ কেজি কর চালানপত্রবিহীন সুতা জব্দ করেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, নারায়ণগঞ্জ। জব্দ করা সুতার আনুমানিক বাজারম‚ল্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বেলা ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার জিমখানা এলাকার টানবাজারে এস আর ট্রেডের গোডাউনে এ অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে চীন, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের তৈরি পলিয়েস্টার ও নাইলন ইয়ার্ন বা সুতা পাওয়া যায় ৭৭ হাজার ৩৯০ কেজি। পাশাপাশি কর চালানপত্রবিহীন ১০ হাজার কেজি স্থানীয় সুতা জব্দ করা হয়।
এনবিআর জানায়, এস আর ট্রেডের স্বত্বাধিকারী রাজীব সাহার গোডাউনটি অনিবন্ধিত। জব্দ করা সুতার বিপরীতে প্রযোজ্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এরইমধ্যে আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

১০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ট্যাক্স ইনভয়েস না থাকায় চারটি অনিবন্ধিত গুদাম থেকে প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ম‚ল্যের ৭২ হাজার ৯৪৪ কেজি সুতা জব্দ করেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট। উপজেলার পুরিন্দা বাজারে হাজী মোবারক মোল্লার মালিকানাধীন অনিক ট্রেডার্সের চারটি অনিবন্ধিত গুদামে অভিযান চালিয়ে এসব সুতা জব্দ করা হয়।

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের এক সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কমিশনারেটের একটি প্রতিরোধম‚লক দল এ অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় গুদামগুলো থেকে প্রয়োজনীয় কর চালান বা ট্যাক্স ইনভয়েসবিহীন চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা ধাতব, পলিয়েস্টার ও নাইলন সুতা উদ্ধার করা হয়।

অভিযানে জব্দ করা সুতার আনুমানিক বাজারম‚ল্য ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। গুদামগুলো অনিবন্ধিত হওয়া এবং সুতার বিপরীতে প্রয়োজনীয় কর চালান না থাকায় এসব পণ্য জব্দ করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে একটি গোডাউনে অভিযান চালিয়ে ১০ টন সুতা জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাস্টমস বন্ড কমিশনার ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। এই সুতার আনুমানিক ম‚ল্য প্রায় এক কোটি টাকা। টানবাজারের বিসমি ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী হাজী বিল্লাল হোসেনের গোডাউনে অভিযান চালিয়ে এসব সুতা জব্দ করা হয়।

কাস্টম ও বন্ড কমিশনার ঢাকা কার্যালয়ের উপ-কমিশনার রেজভি আহমেদ জানান, গাজীপুরের জেলার টঙ্গী উপজেলার ভাদাম এলাকায় অবস্থিত সুপ্রভো কম্পোজিট নিট কারখানায় সুতা বা কাপড় তৈরির জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসব সুতা আনা হয়েছে। এসব সুতা দিয়ে কাপড় তৈরি করে বিদেশ রফতানি করার কথা। কিন্তু সুপ্রভো কম্পোজিট নিট কারখানা বন্ড চুক্তি ভঙ্গ করে অবৈধভাবে নারায়ণগঞ্জের বিসমি ইয়ান ট্রেডিংয়ের কাছে এসব সুতা খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে, যা বন্ডের আইন অনুযায়ী সম্প‚র্ণ অবৈধ ও চোরাচালানের সামিল।

তিনি বলেন, ‘এসব সুতা জব্দ করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আরও কী পরিমাণ সুতা তারা খোলাবাজারে বিক্রি করেছে তা যাচাই করে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের করা হবে।’

কাস্টম বন্ড কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার আল আমিন জানান, আমাদের কাছে র্দীঘদিন ধরে অভিযোগ আসছিল যে- কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল হিসেবে সুতা আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেশীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টম ও বন্ড ঢাকা কার্যালয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে বিসমি ইয়ান টেডিংয়ের মালিক হাজী বিল্লাল হোসেনের মালিকানাধীন গোডাইনে অভিযান চালিয়ে বন্ডের সুবিধায় আনা প্রায় ১০ টন সুতা জব্দ করা হয়। 

এসময় উপস্থিত ছিলেন শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগের কাস্টমস ও বন্ড ঢাকা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রেজভি আহমেদ, সহকারী কমিশনার আল আমিন, শরীফ মোহাম্মদ ফয়সাল, আক্তার হোসেনসহ অনেকে। এসয় তাদের সহায়তা করেন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সিআইডি পুলিশের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে টানবাজারে বিশাল বন্ড সুতার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন ইয়ার্ণ মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন সাহা। মূলত লিটন সাহার মদদপুষ্ট ব্যবসায়ীরাই বন্ড সুতা এনে খোলা বাজারে উচ্চম‚ল্যে বিক্রি করতেন। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুব্রত সাহা, ও সানি সাহা। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের শেল্টারে এরা বন্ড সুতার সিন্ডিকেট গড়ে তোলে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সুব্রত ও সানি সাহারা এখন প্রকাশ্যে নেই। তবে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকই চলছে। তাদের পাশাপাশি ছোট বড় আরো অনেক ব্যবসায়ী বৈধ সুতার বিক্রির আড়ালে পরিচালনা করছেন বন্ড সুতার ব্যবসা। যার কারণে স্থানীয় পোশাক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার।

টানবাজারের সুতা ব্যবসায়ীরা বলেন, বৈধ সুতা ১১ টাকায় কিনে ১২ কি ১৩ টাকায় বিক্রি। আর বন্ড সুতা ৫ টাকা পাউন্ড কিনলে ১৩ টাকায় বিক্রি করা যায়। টানবাজারে এখন ঘরে ঘরে বন্ডের সুতা। অনেকে ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য বন্ড সুতা বিক্রি করতাছে। কারণ ব্যবসার পরিস্থিতি খুব একটা ভালোনা। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের লোভ বেশি আর যারা দ্রæত বড়লোক হতে চায় তারাই এখানে বন্ড ব্যবসা করে। বন্ড সুতা বিক্রি না করলে যে ব্যবসায় টিকে থাকা যাইব না, তাও কিন্তু না। বৈধ ভাবে ব্যবসা করলেই চলে কিন্তু সবাই অবৈধ পথেই মজা পায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন বন্ড সুতা জব্দ করলেও বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সাথে বড় বড় রাঘব বোয়ালদের হাত থাকে। যেকারণে তারা অনায়াতে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলে। এভাবে অত্র এলাকায় বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।  মাঝে মধ্যে দু-একটা অভিযানে সুতা জব্দ করা হলেও সারা বছর এরা দেদারসে ব্যবসা করে আসছে।