ব্যবসায়ী সোহাগ অপহরণের ঘটনায় এখনো আতঙ্ক কাটেনি, সুষ্ঠু বিচারের অপেক্ষা


BANGLAR NARAYANGANJ | Banglar Narayanganj প্রকাশিত: Sep 23, 2026 ব্যবসায়ী সোহাগ অপহরণের ঘটনায় এখনো আতঙ্ক কাটেনি, সুষ্ঠু বিচারের অপেক্ষা
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ সোহাগকে অপহরণ করে নারায়ণগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এক বছরের বেশি সময় পর নতুন মোড় নিয়েছে। বহুল আলোচিত ওই অপহরণ মামলায় পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করেছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আমলি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক এম. সাইফুল ইসলাম সাতজনের বিরুদ্ধে দাখিল করা চার্জশিট গ্রহণ করেন। মামলার অভিযোগপত্র নম্বর ৩১৮। তবে বিভিন্ন সময় মামলার আসামিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন সহ নানা ভয়ংকর পদপেক্ষ নিয়ে ফের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগপত্রে সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন—মো. আল আমিন শেখ ওরফে জিতু, মো. কবির হালদার, লতিফ সিদ্দিকী রতন, সাব্বির আহমেদ, ইরান হোসেন মোহন, মো. সাকিব হোসেন ও মো. ছাহাদ । তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলে আরও তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

চার্জশিট গ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করলেও ঘটনাটিকে ঘিরে আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। বরং ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মামলা-সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে যে, মামলার কয়েকজন আসামি জামিনে বের হওয়ার পর সোহাগ ও তার পরিবারের ওপর মামলা প্রত্যাহারের জন্য ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এ অভিযোগে লতিফ সিদ্দিকী রতন ও সাব্বির নামে দুইজনকে গ্রেপ্তারেও করা  হয়।

এখন চার্জশিট আদালতে গ্রহণের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—একজন ব্যবসায়ী নেতাকে দিনের পর দিন আতঙ্কের মধ্যে রেখে বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা হচ্ছে কি না?

ঘটনার শুরু ২০২৫ সালের ১ জুন রাতে। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এবং মীম শরৎ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সোহাগ ব্যবসায়িক কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন। সরকারি তোলারাম কলেজের সামনে থেকে কয়েকজন ব্যক্তি অস্ত্রের মুখে তাকে তুলে নেয়। পরে তাকে মারধর করে বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো হয় এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে বরিশাল হয়ে পটুয়াখালীর দিকে নেওয়া হয়।

পরদিন ২ জুন পটুয়াখালীর পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাট এলাকায় দুটি গাড়ির একটি থেকে হাত-পা, কোমর ও মুখ বাঁধা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের নজরে আসার পর পুলিশ সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে ঢাকায় নেওয়া হয়।

উদ্ধারের পর সোহাগ যে বর্ণনা দেন, তা ঘটনাটিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। তার অভিযোগ ছিল, অপহরণকারীরা তাকে ইলেকট্রিক শক দেয় এবং মাথায় পিস্তলের বাট দিয়ে আঘাত করে।

একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের পরিচালককে নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে তুলে নিয়ে প্রায় কয়েকশ কিলোমিটার দূরে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে যাওয়ার ঘটনা তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ব্যবসায়ী মহলেও তৈরি হয় উদ্বেগ। প্রশ্ন ওঠে—একজন পরিচিত ব্যবসায়ী যদি রাজধানীর কাছাকাছি একটি শিল্পনগরী থেকে এভাবে অপহৃত হতে পারেন, তাহলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

ঘটনার পর সোহাগের স্ত্রী তানিয়া আহম্মেদ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার নম্বর ১২(০৬)২৫। এতে দণ্ডবিধির ৩৬৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। মামলার এজাহারে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বা পূর্বশত্রুতার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

তদন্তে পুলিশ বিভিন্ন আলামত, সাক্ষীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, ডিজিটাল তথ্য এবং অপহরণে ব্যবহৃত যানবাহনসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করেছে বলে চার্জশিট-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকজন আসামির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য ও অন্যান্য তদন্ত-উপাত্তের ভিত্তিতে সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

মামলার নথিতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, মামলার কয়েকজন আসামি জামিনে বের হওয়ার পর সোহাগকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে সোহাগ ফতুল্লা থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া এবং তার ব্যবসায়িক ছবি সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো।

এ ধরনের অভিযোগের পর বিষয়টি শুধু একটি অপহরণ মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে কি না।

আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তারের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, অপহরণ মামলার একজন প্রধান অভিযুক্ত তখনও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।

চার্জশিট গ্রহণের পর তাই নতুন করে সামনে এসেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে যদি আবারও হুমকি বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা দ্রুত তদন্ত করে দেখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ এই মামলার গুরুত্ব শুধু মোহাম্মদ সোহাগের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে হাজার হাজার ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। একজন ব্যবসায়ী নেতাকে অপহরণ এবং পরে মামলা করার কারণে তাকে হুমকির অভিযোগ ব্যবসায়ী সমাজের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—অপহরণের পরিকল্পনা কোথায় হয়েছিল, এর পেছনে কারা ছিল এবং কেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে নারায়ণগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?

চার্জশিটে সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। একইভাবে তদন্তে তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে—সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের বিষয়।

তবে তদন্তে সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল এবং আদালতের তা গ্রহণ মামলাটিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখন আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে বের হয়ে আসতে পারে সেই রাতের প্রকৃত ঘটনা।

একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে নতুন কোনো হুমকি বা চাপের অভিযোগ উঠলে সেটিও পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ একটি মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার পরও যদি বাদী ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে শুধু মামলা নয়—পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরই তার প্রভাব পড়তে পারে।

মোহাম্মদ সোহাগ আদালত চার্জশিট গ্রহণের পর বলেছেন, তিনি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন এবং চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিরা ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে তিনি মনে করেন। তবে শেষ পর্যন্ত কে কতটা জড়িত ছিলেন, কার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ রয়েছে এবং কার দায় কতটুকু—তা নির্ধারণ করবে আদালত।

এক বছরেরও বেশি সময় আগে নারায়ণগঞ্জের রাজপথ থেকে শুরু হওয়া সেই অপহরণকাণ্ড তাই এখনো শেষ হয়নি। বরং চার্জশিট গ্রহণের পর মামলাটি প্রবেশ করেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে।

একদিকে সাত আসামির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগপত্র, অন্যদিকে মামলা প্রত্যাহারে হুমকির অভিযোগ—দুটি বিষয় পাশাপাশি রেখে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই: একজন ব্যবসায়ীকে অপহরণের এই বহুল আলোচিত ঘটনার পুরো নেপথ্য কি সত্যিই তদন্তে উঠে এসেছে, নাকি এখনও রয়ে গেছে অদৃশ্য কোনো অধ্যায়?